দোনবাস: রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের শিকড় যেখানে

ইউক্রেনকে ঘিরে এ মুহূর্তে পুরো বিশ্ব তোলপাড়। পূর্ব ইউরোপের দেশটিতে প্রায় দুই মাস ধরে রাশিয়ার সামরিক অভিযান অব্যাহত। ফলে দুনিয়া এখন কার্যত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে। ইউক্রেনকে কেন্দ্র করে যা ঘটছে; তার মূলে রয়েছে দোনবাস নামে একটি ঐতিহাসিক অঞ্চল, যা ইউক্রেন-রাশিয়া সীমান্তে অবস্থিত। ইউক্রেনের এই সংঘাত আসলে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়নি। এর শুরু বহু আগে। এ লেখায় সেদিকেই আলোকপাত করা হয়েছে।

0 14,823

এই সংঘাত শুরু থেকেই এত ভয়াবহ ছিল যে এটাকে ইউরোপের কোলে এক টুকরো সিরিয়া, লিবিয়া বা ইয়েমেন বলা চলে। কিন্তু মূলধারার গণমাধ্যমগুলো, বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বের শীর্ষ প্রচারমাধ্যমসমূহ রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে এই সংঘাতের চিত্র তুলে ধরা থেকে বরাবরই বিরত থেকেছে।

প্রায় আট বছর ধরে চলা এই সংঘাতের কারণ বুঝতে গেলে দোনবাসের বিবর্তন বা দোনবাসের দোনবাস হয়ে ওঠাটা বোঝা জরুরি। বর্তমানে দোনবাস শিল্পোন্নত ও খনিজসম্পদে ভরপুর একটা অঞ্চল। কিন্তু বহুকাল  ধরে এর একটা বড় অংশই জনবসতিহীন অবস্থায় পড়ে ছিল।

প্রধানত বৃক্ষহীন ও তৃণাবৃত সমতল প্রান্তর, যা মধ্যযুগের ‘রুশভূমি’ (যা তখনো রাশিয়া, বেলারুশ ও ইউক্রেনের মধ্যে বিলীন হয়ে যায়নি) ভূখণ্ডের দক্ষিণ সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। বন্য জীবজন্তু ভরা এ অঞ্চলকে সেই সময় ডাকা হতো ‘ওয়াইল্ড ফিল্ড’ তথা ‘শ্বাপদসংকুল জঙ্গল’ বলে। বসতি বলতে অল্পসংখ্যক যাযাবর শ্রেণির মানুষ ও কিছু কৃষিজীবীর বাস ছিল। তেরো শতকে ইউরোপে মঙ্গল অভিযানের সময়ও অত্যন্ত ভয়ংকর ছিল এ অঞ্চল। কারণ, এ অঞ্চল এতটাই বিস্তৃত যে, একবার পথ হারিয়ে গেলে তা খুঁজে পাওয়া দুঃসাধ্য ছিল।

মঙ্গল অভিযান-পরবর্তী ৪০০ বছর অর্থাৎ সতেরো শতকের প্রথম অর্ধ পর্যন্তও এ অঞ্চল প্রধানত জনবসতিহীনই ছিল। এরপর হাতে গোনা কিছু কৃষক এখানে আস্তে আস্তে বসতি গড়ে তোলেন, যারা প্রধানত রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে এসেছিলেন।

পরিবর্তন শুরু হয় মূলত আঠারো শতকের প্রথম দিকে। ইউরোপজুড়ে শিল্পবিপ্লব শুরু হলে ১৭২১ সালে এখানে কয়লার বিশাল মজুত আবিষ্কার হয়, যা ছিল শিল্প ও কলকারখানা সচল রাখার প্রধান কাঁচামাল। এর ফলে একসময়ের বিস্তীর্ণ তৃণভূমি হয়ে ওঠে ব্যবসা-বাণিজ্যকেন্দ্র। গড়ে ওঠে নতুন নতুন শহর যেগুলোকে বর্তমান শিল্পোন্নত দোনবাসের ভিত্তি বলা যায়। নতুন আবিষ্কার হওয়া রক সল্ট তথা বিট লবণ ব্যবসাকে কেন্দ্র করে প্রথম শহরটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৬৭৬ সালে।

দোনেৎস্ক শহরের গোড়াপত্তন

এরপর আরও একবার বড় পরিবর্তন ঘটে উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে, যাকে বলা যায় ‘আ গ্রেট লিপ ফরওয়ার্ড’। জন হাফস নামে এক ব্রিটিশ শিল্পপতির হাত ধরে গড়ে ওঠে ইউজুভকা শহর, যা একসময় সাদামাটা একটি গ্রাম ছিল। ইউজুভকা গ্রামের পাশেই ১৮৬৯ সালে একটি কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন জন।

নগরায়ণের ধারাবাহিকতায় সেই ইউজুভকা আরও কিছু নাম পরিগ্রহ করে। অবশেষে ১৯৬১ সালে স্থানীয় এক প্রভাবশালী ব্যক্তি এর নাম দেন দোনেৎস্ক, যা বর্তমানে এ অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর। ১৮৬৮ সালে গড়ে ওঠে ক্রামাতোরস্ক শহর, এরপর ১৮৭৮ সালে দেবালৎসেভ।

কয়লার মজুত আর একের পর এক কারখানা প্রতিষ্ঠার কারণে এ অঞ্চলের চেহারা পাল্টে যেতে থাকে। সেই সঙ্গে শহরগুলো খুব দ্রুতই বিস্তার লাভ করে। শহরগুলো উন্নত রাস্তাঘাট ও যোগাযোগব্যবস্থার মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত হয়, যা আজও অব্যাহতভাবে চলছে।

উনিশ শতকের শেষদিকে এ অঞ্চল রুশ সাম্রাজ্যের প্রয়োজনীয় জ্বালানির অন্যতম প্রধান জোগানদাতা হয়ে ওঠে। ফলে এর উন্নয়নের গতি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। আজ আমরা যে দোনবাসকে জানি, তা মূলত উনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের প্রথমার্ধে গড়ে উঠেছে।

দোনবাস শব্দটি মূলত রুশ ভাষা থেকে এসেছে। ‘দনেৎস্কি উগোলিনি বাসেইন’ (ইংরেজি ‘দনেৎস কোল বেসিন’) শব্দগুচ্ছের সংক্ষিপ্ত রূপ। যার বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘দনেৎস কয়লা অববাহিকা’। ঐতিহাসিকভাবে দনেৎস নদীর তীরবর্তী এ অঞ্চল কয়লা সমৃদ্ধ। অবশ্য বর্তমানে ‘দোনবাস’ বলতে সাধারণভাবে শুধু দোনেৎস্ক ও লুহানস্ককে বোঝায়।

এখানে যে জনবসতি গড়ে উঠেছে, তা মূলত পার্শ্ববর্তী বর্তমান রাশিয়া ও ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা। এদিক থেকে দোনবাসকে একটা উপনিবেশ বলা চলে এবং এর জনসংখ্যা খুবই বিচিত্র। ভাষা ও সংস্কৃতির সাদৃশ্যের কারণে দুই দেশের মানুষ সহজেই এক অঞ্চলে এসে মিশে গেছে। ১৮৯৭ সাল পর্যন্ত এ অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার ৫২ শতাংশ ছিল ইউক্রেনীয়। রুশদের সংখ্যা ছিল ২৮ শতাংশ। এ ছাড়া গ্রিক, জার্মান ও তাতার জাতির মানুষের উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য।

রাশিয়া ও ইউক্রেনের উত্থানপতনের ইতিহাস

প্রকৃতপক্ষে রাশিয়া ও ইউক্রেনের ইতিহাস বহু শতাব্দী ধরেই একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এবং সেই ইতিহাস অত্যন্ত জটিল। রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয়েরই প্রধান ধর্ম অর্থোডক্স খ্রিষ্টান। তাদের ভাষা, সংস্কৃতি এবং খাদ্য–এগুলো একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।

ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ অতি প্রাচীন শহর এবং রুশ জনগোষ্ঠীর একসময়ের রাজধানী। এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল রাশিয়ার বর্তমান রাজধানী মস্কোর চেয়েও কয়েক শতাব্দী আগে। রুশ ও ইউক্রেনীয় উভয় জনগোষ্ঠীই দাবি করে থাকে, কিয়েভই হচ্ছে তাদের আধুনিক সংস্কৃতি, ধর্ম ও ভাষার মূল কেন্দ্র। তবে এখন যা ইউক্রেন তার ঐতিহাসিক বাস্তবতা হচ্ছে, গত এক হাজার বছরে তাদের সীমান্ত, ধর্ম ও জনগোষ্ঠীর প্রকৃতি বারবার পরিবর্তিত হয়েছে।

কিয়েভান রুশ বা ’কিয়েভের রুশ’

ইউক্রেন আর রাশিয়ার অভিন্ন উৎসের সবচেয়ে পুরোনো খোঁজ পাওয়া যায় ইউরোপের ওই অঞ্চলে স্লাভ জনগোষ্ঠীর প্রথম রাষ্ট্রের ইতিহাসে। সেটা ছিল মধ্যযুগের এক সাম্রাজ্য, যার নাম ‘কিয়েভান রুশ’। আর এর প্রতিষ্ঠা হয়েছিল নবম শতাব্দীতে।

বর্তমান ইউক্রেন, বেলারুশ এবং রাশিয়ার অংশ নিয়ে গঠিত হয়েছিল এই কিয়েভান রুস। আজ পর্যন্ত এই তিন দেশই দাবি করে যে, কিয়েভান রুসই হচ্ছে তাদের সাংস্কৃতিক পূর্বপুরুষ। ’কিয়েভান রুস’ কথাটির সরল অর্থ হচ্ছে ’কিয়েভের রুশদের আবাসভূমি’। তাদের রাজধানী ছিল কিয়েভ। আর এই রাজ্যের অধিবাসীদের বলা হত রুস।

এই কিয়েভান রুসের প্রতিষ্ঠা করেছিল ভাইকিংরা। এরা মূলত উত্তর ইউরোপের স্ক্যান্ডিনেভিয়া বা সুইডেন-নরওয়ে-ডেনমার্ক অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর লোক ছিল। রুশ জাতির আদি উৎস নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ আছে। কেউ বলেন, রুশদের আদি পূর্বপুরুষরা ছিল সুইডেনের। আবার আরেক দল ইতিহাসবিদ মনে করেন, এটা ঠিক নয়। রুশরা হচ্ছে স্লাভ জনগোষ্ঠীর বংশধর।

কিয়েভ শহরটির অবস্থান এমন এক জায়গায় যেখান দিয়ে নবম-দশম শতাব্দীতে অনেকগুলো প্রাচীন বাণিজ্যিক পণ্য চলাচলের পথ গড়ে উঠেছিল। ইউক্রেনের ভূ-প্রকৃতিরও আছে অনেক বৈচিত্র্য। এখানে আছে কৃষিজমি, বনভূমি আর কৃষ্ণসাগর হয়ে নৌচলাচলের পথ। তাই বিভিন্ন সময় বহু যোদ্ধা জনগোষ্ঠীর দখলে ছিল এই এলাকাটি।

আধুনিক ইউক্রেনের কিছু অংশ বহু শতাব্দী ধরে রুশ সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। কিন্তু ইউক্রেনের অন্য কিছু অঞ্চল আবার বিভিন্ন সময় অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্য, পোল্যান্ড বা লিথুয়ানিয়ারও অংশ ছিল। ইউক্রেনের ভূখণ্ড অটোমান তুর্কদেরও দখলে ছিল কিছু সময়ের জন্য। কিন্তু এর মধ্যে আবার বিভিন্ন সময় এমন কিছু দৃষ্টান্তও আছে যখন সাময়িকভাবে হলেও ইউক্রেন রাষ্ট্রের একটি স্বতন্ত্র অস্তিত্ব দেখা গিয়েছিল।  যেমন সপ্তদশ শতাব্দীতে ইউক্রেনীয় কসাকদের স্বায়ত্বশাসিত রাজ্য।

রুশ বিপ্লব ও গৃহযুদ্ধ

এরপর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটে ১৯১৭ সালে এসে। পরপর দুটি বিপ্লব (যা রুশ বিপ্লব হিসেবে পিরিচিত) ও গৃহযুদ্ধ রাশিয়ার ইতিহাসকে ‘বিপ্লবপূর্ব’ ও ’বিপ্লব পরবর্তী’ এই দুই ভাগে বিভক্ত করে দেয়। ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে (গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জী অনুযায়ী মার্চ মাস) সংঘঠিত প্রথম বিপ্লবের মাধ্যমে রাশিয়ার জার সম্রাজ্যের পতন ঘটে এবং শেষ রুশ সম্রাট দ্বিতীয় নিকোলাসকে উৎখাত করে একটি অন্তবর্তীকালীন সরকার গঠন করা হয়। দ্বিতীয় বিপ্লবের (অক্টোবর বিপ্লব) মাধ্যমে অন্তর্বতীকালীন সরকারকে উৎখাত করে বলশেভিক (কমিউনিস্ট) সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়।

এ সময় দোনবাস অঞ্চলের শাসনভার প্রোভিশনাল কমিটি নামে একটি অস্থায়ী পরিষদের হাতে দেওয়া হয়। এরই মধ্যে ইউক্রেন প্রথমে নিজেদের স্বায়ত্বশাসন এবং এরপর অক্টোবর বিপ্লবের পর স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়। তারা বিশাল একটা ভূখণ্ডকে নিজেদের এলাকা বলে দাবি করে যার মধ্যে দোনবাস অঞ্চলও ছিল। ইউক্রেনের দাবি অনুযায়ী, ইউজুভকা বা বর্তমান দোনেৎস্ক ছিল একটা সীমান্তবর্তী শহর। নিজেদের ভূখণ্ড দাবি করলেও ইউক্রেন দোনবাসের বেশিরভাগ এলাকায় কর্তৃত্ব করেনি এবং শিগগিরই প্রভিশনাল কমিটির সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে।

রুশ বিপ্লবের পর ১৯১৭ থেকে ১৯২০ সালের মধ্যে ক্রিমিয়াসহ ইউক্রেনের এক বড় অংশ রাশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন ইউক্রেন প্রজাতন্ত্র গঠনের চেষ্টা করে। কিন্তু রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধবিক্ষুব্ধ ও চরম বিশৃঙ্খল সময়ে তাদের সেই চেষ্টা সফল হতে পারেনি। রুশ বিপ্লবের নেতা ভ্লাদিমির লেনিনের নেতৃত্বাধীন সোভিয়েত সরকার স্বাধীন ইউক্রেন গঠনের চেষ্টাকে দমন করে। ফলে দোনবাসসহ ইউক্রেনের বেশিরভাগ ভূখণ্ডই সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।

সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ হিসেবে ইউক্রেনের নাম হয় ইউক্রেনিয়ান সোভিয়েত সোশালিস্ট রিপাবলিক। বলা যায়, আজকের ইউক্রেনের মানচিত্র তৈরি হয়েছে রুশ বিপ্লব এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়েই। কিন্তু ইউক্রেনীয় জাতীয়তাবাদ এবং নিজস্ব রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষা বা প্রয়াস বরাবরই ছিল।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও ইউক্রেনের জন্ম

অবশেষে সাত দশকেরও বেশি সময় পর ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়। সৃষ্টি হয় ১৫টি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র। যার একটি ইউক্রেন। ইউক্রেন আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করে আগস্ট মাসে। আর একই বছরের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত এক গণভোটে দেশটির জনগণ বিপুলভাবে এর পক্ষে রায় দেয়।

সংকটের মূলে ভাষা ও সংস্কৃতি

রাশিয়া ও ইউক্রেনের বর্তমান রাজনৈতিক-সামরিক সংঘাত আসলে দেশ দুটির পুরোনো সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বের নতুন প্রকাশমাত্র। ইউক্রেন সাংস্কৃতিকভাবে বিভক্ত এক জাতি। এর নাগরিকদের একদল আজন্ম রাশিয়াপন্থী, অন্য দল রাশিয়াবিরোধী। দ্বিতীয় দল নিজেদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে ‘ইউক্রেন জাতীয়তাবাদ’ হিসেবে চিহ্নিত করে।

স্থানীয় সমাজের গভীরে থাকা এই বিভক্তি রুশ ও ইউক্রেন ভাষার ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব থেকে। গত দু-তিন দশকে এই দ্বন্দ্ব ক্রমে রাজনৈতিক চেহারা নিচ্ছিল। সর্বশেষ তা সামরিক রূপ নিয়েছে। ইউক্রেনের দাপ্তরিক ভাষা ইউক্রেনিয়ান হলেও এর সংস্কৃতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে রুশদের আধিপত্য ব্যাপক। রাশিয়ার অনেক তাত্ত্বিকই ইউক্রেনিয়ানকে রুশ ভাষার উপভাষা মনে করেন। এই দুই ভাষার বৈরিতার প্রকাশ ঘটছে বহু মাধ্যমে।

সাংস্কৃতিক সংঘাতের ফল হিসেবে ইউক্রেনে যখনই কোনো নির্বাচন হয়, বরাবরই তাতে স্থানীয় জাতীয়তাবাদীদের ঠেকাতে পর্দার আড়ালে থেকে কাজ করে মস্কো। কিন্তু সব সময় তারা সুবিধা করতে পারে না। জাতীয়তাবাদীরাও দীর্ঘ চেষ্টার পরও রাশিয়ার প্রভাব থেকে দেশকে মুক্ত করতে পারেনি।

ইউক্রেনের অনেক অঞ্চলে বিশেষ করে পূর্বাঞ্চলের দোনবাসে রুশভাষীদের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। রুশ নেতাদের দাবি, রাশিয়ান ও ইউক্রেনিয়ানরা ‘একই জনগোষ্ঠী’ এবং উভয়ই রাশিয়ান সভ্যতার অংশ। আরেক প্রতিবেশী দেশ বেলারুশকেও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেন তিনি। তবে এ দাবি নাকচ করে আসছেন ইউক্রেনিয়ানরা।

বিদ্রোহীদের পৃষ্ঠপোষকতা

চলতি শতকে ইউক্রেনে দুই দফা গণ–অভ্যুত্থান ঘটেছে। ২০০৫ ও ২০১৪ সালে উভয় ক্ষেত্রেই বিক্ষোভকারীরা রাশিয়ার শ্রেষ্ঠত্ব অস্বীকার করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো জোটে দেশের অন্তর্ভুক্তির দাবি তোলে। ২০১৪ সালে ইউক্রেনে কয়েক মাসের বিক্ষোভের মুখে মস্কোপন্থী প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচের পতন ঘটে। এ সময় ইউক্রেনের ক্রিমিয়া অঞ্চল দখল করে নেয় রাশিয়া। মস্কো ওই দখলের ন্যায্যতা তৈরি করে ক্রিমিয়ার ভেতরকার রুশপন্থীদের বিদ্রোহের মাধ্যমে।

ইউক্রেন এখনও ক্রিমিয়াকে নিজ এলাকা মনে করে। কিন্তু রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ থেকে সেটা উদ্ধারের শক্তি নেই দেশটির; বরং আরও এলাকা হারানোর শঙ্কায় আছে। এসব বিবেচনা থেকে ইউক্রেনের জাতীয়তাবাদীরা কয়েক বছর ধরে চেষ্টা চালাচ্ছে দেশকে পুরোপুরি ইউরোপমুখী করে ন্যাটোর বলয়ে নিতে। অপর দিকে নিজের সীমান্তের সামনে ন্যাটোর সম্ভাব্য ঘাঁটি নিয়ে শঙ্কিত রাশিয়া। দেশটির নেতারা বলে আসছেন, যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন এই সামরিক জোটে ইউক্রেনের যোগ দেওয়াটা হবে চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম করা।

দোনবাস বর্তমান সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু

দোনেৎস্ক এবং লুহানস্ক পূর্ব ইউক্রেনের দোনবাস অঞ্চলের দুটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। ২০১৪ সালে রুশ সীমান্তবর্তী এই দুটি এলাকার বিশাল অংশের নিয়ন্ত্রণ নেয় বিচ্ছিন্নতাবাদীরা এবং দোনেৎস্ক পিপলস রিপাবলিক (ডিএনআর) ও লুহানস্ক পিপলস রিপাবলিক (এলএনআর) বলে ঘোষণা করে। এরপর ইউক্রেন এই দুটি এলাকাকে ‘সাময়িকভাবে অধিকৃত অঞ্চল’ অভিহিত করে এর উদ্ধারে সামরিক অভিযান শুরু করে।

সংকট নিরসনে ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যস্থতায় ২০১৫ সালে ‘মিনস্ক চুক্তি’ নামে একটি চুক্তি হয়। এতে রাশিয়া ও ইউক্রেন একমত হয় যে দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক অঞ্চলদুটিকে বিশেষ মর্যাদা দেয়া হবে। আর এর বিনিময়ে ইউক্রেন তার সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাবে। কিন্তু এ চুক্তির বাস্তবায়ন আজও হয়নি এবং এর জন্য উভয় পক্ষই একে অপরকে দোষারোপ করে আসছে।

গত ৮ বছর ধরে অঞ্চল দুটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইউক্রেনীয় বাহিনীর সঙ্গে রুশপন্থীদের সংঘাত বিরাজ করছে। আর এই সংঘাতে প্রাণ হারিয়েছে ১৪ হাজারের বেশি মানুষ। দোনবাসে ’গণহত্যা’ চালানোর অভিযোগ এনে গত ২২ ফেব্রুয়ারি দোনেৎস্ক ও লুহানস্ককে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এর দুদিন পর ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু হয়। 

Leave A Reply

Your email address will not be published.