বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ‘ওপেনিং জুটি’

0 12,770

ক্রিকেটের সবচেয়ে ছোট পরিসরে বাংলাদেশের ভাল খেলার রেকর্ড খুব কম। খারাপ খেলে হারের রেকর্ডই বেশি। একটি ছোট্ট পরিসংখ্যানেই মিলবে তার প্রমাণ। সেই ২০২১ সালের অক্টোবরে আরব আমিরাতে হওয়া বিশ্বকাপ থেকে এই ক’দিন আগে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে শেষ হওয়া তিনজাতি আসর পর্যন্ত ২৭ ম্যাচে বাংলাদেশ হেরেছে ২০ টিতে।

গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ওমান আর পাপুয়া নিউগিনির বিপক্ষে দুটি মাত্র ম্যাচ জেতা ছাড়া সব খেলায় হেরেছিল বাংলাদেশ। আর এ বছর ১৮ খেলায় অংশ নিয়ে জিতেছে মোটে ৬টিতে। তার একটি করে দুই জয় আফগানিস্তান আর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। আর দুটি জয় আছে ওয়েষ্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। শেষ দুটি ম্যাচ জিতেছে আরব আমিরাতের বিপক্ষে। একটি ম্যাচে কোন ফল নিষ্পত্তি হয়নি। বৃষ্টিতে ধুয়ে মুছে গেছে।

কেন টি টোয়েন্টি ফরম্যাটে বাংলাদেশের পারফরমেন্স আর ফল এত খারাপ? কী কারণে পারে না টিম বাংলাদেশ? বোদ্ধা, বিশ্লেষক, ক্রিকেট পন্ডিতদের সবাই কম বেশি একমত হয়েছেন যে, বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি ভাল না খেলার পেছনে প্রধান কারণ দুটি। এক ব্যাটিংয়ে শুরু ভাল না হওয়া। দুই ডেথ ওভারে বোলিংটা ঠিক মত না হওয়া।

বেশির ভাগ দল ৬ ওভারের পাওয়ার প্লে’র ফিল্ডিং বিধিবদ্ধতা কাজে লাগিয়ে ৫০-৬০ রান তুলে বড় স্কোরের পথে এগিয়ে যায়। বাংলাদেশ তা পারে না। পাওয়ার প্লে’তে ৫০ থেকে ৬০ রান তোলা বহুদুরে, ওই পাওয়ার প্লে’তে উল্টো ব্যাটিং মেরুদন্ড ভেঙ্গে যায় বাংলাদেশের। ওই সময়েই বাংলাদেশ ২ থেকে ৩ উইকেট হারিয়ে চলে যায় ব্যাক ফুটে। যেখান থেকে আর সামনে আসা সম্ভব হয় না।

আর সবচেয়ে দুর্বল ও কমজোরি জায়গা হলো ওপেনিং জুটি। মাত্র ১২০ বলের খেলা। যেখানে বেশির ভাগ দলের ওপেনাররাই বড় সময় উইকেটে কাটিয়ে স্কোর বোর্ডকে মোটা তাজ করে দেন। সেখানে বাংলাদেশের ওপেনিং জুটি শুরু হতেই ভেঙ্গে যায়।

Miraj

গত এক বছরের বেশি সময় ধরে চলছে ওপেনিং সংকট। এখন পর্যন্ত এমন একটা ম্যাচও নেই যাতে বাংলাদেশের ওপেনাররা পাওয়ার প্লে’র পুরো ৬ ওভার খেলে ৫৫-৬০ রান তুলে দিয়েছেন।

গত বছর অক্টোবরে ওমানের মাটিতে স্কটল্যান্ডের কাছে টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ থেকে শুরু। এই সেদিন ক্রাইস্টচার্চে পাকিস্তানের বিপক্ষে ত্রিদেশীয় সিরিজের শেষ ম্যাচ পর্যন্ত প্রায় প্রতি খেলায় বাংলাদেশের ওপেনাররা ব্যর্থতার ঘানি টেনেছেন।

গত বিশ্বকাপে একমাত্র শ্রীলঙ্কার সঙ্গে মূল পর্বের ম্যাচে নাইম শেখ আর লিটন দাসের উদ্বোধনী জুটিতে উঠেছিল ৪০ রান। এছাড়া প্রাথমিক পর্বের বাকি খেলাগুলোয় ২৫ রানের ওপেনিং জুটিও তৈরি হয়নি। বাকি উদ্বোধনী জুটিগুলো ছিল এমন- ০, ৮, ১১, ১৪, ২১, ২২, ২১, ২২ ও ১।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পর থেকে ওপেনিং সংকট কাটাতে বার বার ওপেনার পরিবর্তন করা হয়। উদ্বোধনী জুটির ক্ষত সারাতে চলে মেরামতের কাজ। একে একে নাইম শেখ, লিটন দাস, সাইফ হাসান, নাজমুল হোসেন শান্ত, মুনিম শাহরিয়ার, এনামুল হক বিজয় ও পারভেজন হোসেন ইমনকে দিয়ে ট্রাই করানো হয়; কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি।

এরপর প্রথাগত চিন্তা বাদ দিয়ে টিম ম্যানেজমেন্ট হঠাৎ ‘মেকশিফট ওপেনিং’ জুটি গড়ার কথা ভাবে। গত সেপ্টেম্বরে আরব আমিরাতের মাটিতে এশিয়া কাপে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে শেষ ম্যাচে সাব্বির রহমান রুম্মন ও মেহেদি হাসান মিরাজকে দিয়ে ‘মেকশিফট’ ওপেনিং জুটি সাজানো হয়।

সেই জুটি এশিয়া কাপে একটি, আরব আমিরাতের বিপক্ষে দুবাইতে দুটি আর আর নিউজিল্যান্ডের মাটিতে ত্রিদেশীয় আসরেও এক ম্যাচে ইনিংসের গোড়াপত্তন করে; কিন্তু এক ম্যাচেও সাফল্য আসেনি। মিরাজ শ্রীলঙ্কার সঙ্গে এশিয়া কাপে ২৬ বলে ৩৮, আর আরব আমিরাতের বিপক্ষে দ্বিতীয় ও শেষ ম্যাচে ৩৭ বলে ৪৬ রানের দুটি মোটামুটি ইনিংস উপহার দিলেও সাব্বির রহমান রুম্মন (৫, ০, ১২ আর ১৪ ) কিছুই করতে পারেননি। এ জুটির সর্বোচ্চ অবদান ছিল ২৭। বাকি তিন ম্যাচে সাব্বির-মিরাজের উদ্বোধনী জুটিতে এসেছে মাত্র ১৯, ১১, ও ২৫ রান।

এরপর ক্রাইস্টচার্চে শেষ ৩ ম্যাচে আবার প্রথাগত ওপেনার দিয়ে ইনিংসের সূচনা করা হয়; কিন্তু তাতেও সাফল্যের দেখা মেলেনি। শেষ তিন ম্যাচে তিন-তিনটি ওপেনিং জুটি খেলানো হয়। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচে নাজমুল হোসেন শান্ত (৩৩ বলে ২৯) মিরাজ (৫ বলে ৫), নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ফিরতি পর্বে নাজমুল হোসেন শান্ত (১২ বলে ১১) আর লিটন দাস (১৬ বলে ২৩) এর উদ্বোধনী জুটি ভাঙ্গে মাত্র ২৪ রানে। আর পাকিস্তানের সঙ্গে শেষ ম্যাচে নাজমুল হোসেন শান্ত (১৫ বলে ১২) ও সৌম্য সরকার (৪ বলে ৪) প্রথম উইকেটে মাত্র ৭ রান তুলে দিতে পারেন।

পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে দলকে একটা মজবুত ভিত গড়ে দেয়ার পরিবর্তে প্রায় ম্যাচেই ব্যর্থ হয়ে উল্টো মুখ থুবড়ে পড়ছে বাংলাদেশের ওপেনিং জুটি। একজন ওপেনারও লম্বা সময় উইকেটে থেকে দীর্ঘ ইনিংস উপহার দিতে পারছেন না। সে কারণেই আগে কিংবা পরে যখনই হোক না কেন, স্কোরলাইন একদমই বড় হচ্ছে না।

এক কথায় ব্যাটিংয়ে চরম রান খরা। এক গভীর সংকট। ওপেনিং ভাল না হলে এ সংকট কাটানো অসম্ভব। ওপেনারদের জ্বলে ওঠার তাই বিকল্প নেই। পাকিস্তান এক বাবর আজম আর মোহাম্মদ রিজওয়ানের দারুন ওপেনিং জুটির ওপর ভর করে একেক পর এক সাফল্য তুলে নিচ্ছে। আর সেখানে বাংলাদেশ ওপেনিং ভাল না হওয়ায় চরম বিপর্যয়ের সন্মুখীন হচ্ছে।

ওপেনাররা ক্রমাগত খারাপ খেলায় টিম ম্যানেজমেন্ট বাধ্য হয়ে একের পর এক জুটি বদল করে যাচ্ছেন। তাতেও কোন সাফল্যের দেখা মিলছে না। টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার শ্রীধরন শ্রীরাম বলেছেন, তাদের হাতে দুই থেকে তিনটি ওপেনিং ‘অপশন’ আছে। তারা পরিবেশ, পরিস্থিতি আর প্রতিপক্ষ দেখে ও বুঝে তার প্রয়োগ ঘটাবেন। তার মানে ধরে নেয়া যায় ওপেনিং সংকট কাটাতে

হয়তো নাজমুল হোসেন শান্ত, সৌম্য সরকার, লিটন দাস কিংবা মেহেদি হাসান মিরাজকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে খেলানোর কথা ভাবা হচ্ছে। তাদের যে দুজনকেই খেলানো হোক না কেন, জুটি বড় হতে হবে। শুরুতে দুই ওপেনারদেরকে রান করতেই হবে।

প্রথম ৬ ওভারের পাওয়ার প্লে’তে উত্তাল উইলোবাজি মানে উড়ন্ত সূচনা না হোক, যত কম সম্ভব উইকেট না হারিয়ে অন্তত শুভ সূচনা খুব জরুরি। ওপেনারদের ভাল খেলার কোনোই বিকল্প নেই। ওপেনাররা যদি ওভার পিছু ৯-১০ রান তুলে দিতে নাও পারেন, সমস্যা নেই। প্রথম ৬ ওভারে যদি বিনা উইকেটে ৪০ প্লাস রানও ওঠে, সেটাই পরবর্তী ব্যাটারদের নিশ্চিন্তে, নির্বিঘ্নে ও সাবলীল ব্যাট চালনায় রাখতে পারে সহায়ক ভূমিকা।

সে কাজটি কি হবে? টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মূল পর্বে ভারত, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকার মত প্রতিষ্ঠিত শক্তি ও বড় দলের বিপক্ষে ওপেনাররা কী অন্তত শুভ সূচনা করতে পারবেন?

এআরবি/আইএইচএস JN

Leave A Reply

Your email address will not be published.