মহামারী রূপ নেওয়া কভিড-১৯-এর ধাক্কা কাটিয়ে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াচ্ছে ল-ভ- হওয়া অর্থনীতি। মহামারী সত্ত্বেও বিদায়ী অর্থবছরে ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে বলে খসড়া হিসাব দিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। স্বাস্থ্যবিধি মেনে সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়েই শুরু হয়েছে কর্মচাঞ্চল্য। স্থানীয় উৎপাদনের সঙ্গে বাড়তে শুরু করেছে রপ্তানি। বেড়েছে রেমিট্যান্স প্রবাহ। অর্থনীতিকে আরও নির্ভার করছে বাংলাদেশ ব্যাংকের শক্তিশালী রিজার্ভ। গার্মেন্ট খাতের স্থগিত ক্রয়াদেশগুলো আবার ফিরে এসেছে। ফলে এ খাতের হতাশাও কাটতে শুরু করেছে।

এদিকে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক বলছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত উদ্ধার করতে সক্ষম দেশটি। ব্যাংকটি বলছে, বাংলাদেশের ব্যালান্স অব পেমেন্ট উদ্বৃত্ত, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী, রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। দেশের ব্যবসায়ীরাও বেশ আত্মবিশ্বাসী। অচিরেই বাংলাদেশ এর সুফল ভোগ করবে বলে মনে করে ব্যাংকটি। বুধবার এক ভার্চুয়াল ব্রিফিংয়ে কভিড-১৯ ও বাংলাদেশের অর্থনীতি মূল্যায়ন করে এসব তথ্য জানিয়েছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ মিশনের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, কভিড-১৯-এর অচলাবস্থার মধ্যেই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন করে চাহিদা তৈরি হওয়ায় ধীরে ধীরে সচল হচ্ছে সামগ্রিক অর্থনীতি। গত মার্চ-এপ্রিলের তুলনায় জুন-জুলাইয়ের অর্থনীতি অনেকটা সচল। করোনাকে সঙ্গী করেই কাজকর্ম শুরু করেছে মানুষ। কলকারখানার উৎপাদন স্বাভাবিকের তুলনায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ শুরু হয়েছে। কিন্তু একে পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়ানো বলা যাবে না। তবে সচল তো হচ্ছে। জানা গেছে, এরই মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অফিস-আদালত, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, পর্যটন কেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সবকিছুই খুলতে শুরু করেছে। অর্থনীতি বাঁচাতে ও পর্যটক বাড়াতে দেশে দেশে সীমান্ত খুলে দেওয়া হচ্ছে। জীবন ও জীবিকার তাগিদে এ মুহূর্তে পৃথিবীর কোনো দেশ পুরোপুরি লকডাউনে নেই। তবে লকডাউন শিথিলের পর করোনা সংক্রমণের হার বাড়তে থাকায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কলম্বিয়া, ভারত আর ইরানের মতো দেশগুলো কিছু অঞ্চলভিত্তিক লকডাউন আরোপ করছে। করোনার প্রকোপ সামলাতে বাংলাদেশেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে আজ আবার শুরু হচ্ছে সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালত। ফলে আবার অর্থনৈতিক কর্মকান্ড চাঙ্গা হয়ে উঠবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর আগে বোরো মৌসুমে বাম্পার ফলন হওয়ায় দেশের অভ্যন্তরীণ খাদ্য পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত সন্তোষজনক। এমন মহামারীতেও খাদ্য সংকটে পড়েনি বাংলাদেশ। এখন পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ রয়েছে। এদিকে করোনা মহামারীর কারণে বিশ্ব অর্থনীতির যে ক্ষতি হবে, এর আর্থিক পরিমাণ হতে পারে ১২ ট্রিলিয়ন ডলার- এমন পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। বাংলাদেশেও টানা ৬৬ দিনের সাধারণ ছুটিতে করোনায় আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকা। এ ক্ষতি পোষাতে সামনে অনেক দিন লড়তে হবে বলে মনে করেন শিল্প খাত-সংশ্লিষ্টরা। ইতোমধ্যে সরকার-ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের সুবিধা পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অনেক ব্যবসায়ীই ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছেন। কেউ কেউ নতুন ব্যবসা শুরুর কথা ভাবছেন। আর যাদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে, তারাও বিকল্প ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ভাবতে শুরু করেছেন। এদিকে করোনা মহামারীর শুরুতে রেমিট্যান্স প্রবাহে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়লেও দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়েছে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি। শুধু তাই নয়, প্রবাসীরা রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন গত দুই মাস। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেকর্ড ছুঁয়েছে, যা গতকাল পর্যন্ত ৩৬ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। আর সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছে ১ হাজার ৮২০ কোটি ৫০ লাখ (১৮ দশমিক ২০ বিলিয়ন) ডলার, টাকার অঙ্কে যা ১ লাখ ৫৪ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা। এদিকে মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে রপ্তানিতে ব্যাপক ধস নামে। কিন্তু জুনে রপ্তানি বাড়তে শুরু করে। আর গত বছর জুলাইয়ের তুলনায় চলতি বছর জুলাইয়ে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ০ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। বুধবার বাংলাদেশের অর্থনীতির সামগ্রিক মূল্যায়ন তুলে ধরে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের এশীয় অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ এডওয়ার্ড লি জানান, বাংলাদেশ এখন ব্যবসায় অনিশ্চয়তা কাটিয়ে উঠেছে। এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার দুটি দেশ ২০২০ সালে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারবে। এর মধ্যে একটি বাংলাদেশ। তিনি বলেন, সাধারণ ছুটি শেষ হওয়ার পর অর্থনৈতিক চাকা ঘুরতে শুরু করেছে। মানুষের মনে আস্থা ফিরেছে। কেনাবেচা বেড়েছে। এসবের ওপর ভর করেই এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের আরেক অর্থনীতিবীদ সৌরভ আনন্দ বলেন, কোন খাতের ওপর ভর করে অর্থনীতি এগিয়ে যাবে তা সুনির্দিষ্ট করে বলা যাবে না। তবে ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ফিরে আসা ও সরবরাহ ব্যবস্থা চালু থাকাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ব্যাংকটি বলছে, বাংলাদেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচক ভালো রয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ার কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে। ফলে আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্য বাংলাদেশের চিন্তার কিছু নেই। অন্যদিকে অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ কম। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি স্বস্তির খবর। কারণ মহামারী মোকাবিলায় অনেক টাকার প্রয়োজন। বাংলাদেশ এ অর্থ জোগানে বিদেশি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঋণ নিতে পারবে। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতি ইউরোপ-আমেরিকার অর্থনীতির ওপর নির্ভর করছে বলে মনে করে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড। অন্যদিকে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘কভিড-১৯-এর অচলাবস্থার মধ্যেই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন করে চাহিদা তৈরি হওয়ায় ধীরে ধীরে সচল হচ্ছে সামগ্রিক অর্থনীতি। মার্চ-এপ্রিলের তুলনায় জুন-জুলাইয়ের অর্থনীতি অনেকটা সচল। গার্মেন্ট খাতের অর্ডারগুলো ফিরে আসতে শুরু করেছে। কিন্তু ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোর চাহিদা বৃদ্ধি এবং সেখানকার করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভর করছে আমাদের রপ্তানি। মার্চ-এপ্রিলের তুলনায় জুলাইয়ে রপ্তানি বেড়েছে। কিন্তু গত বছর জুলাইয়ের তুলনায় চলতি বছর জুলাইয়ে রপ্তানি বেড়েছে মাত্র ০ দশমিক ৬ শতাংশ। ফলে এটিকে তো ভালো প্রবৃদ্ধি বলা যায় না। আবার বিদেশ থেকে যারা ফিরে এসেছেন, তাদের কর্মসংস্থান আমরা করতে পারছি না। তারা নিজেরাই হয়তো চেষ্টা করছেন কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার। একইভাবে আমাদের রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি বেশ ভালো। কিন্তু এটা তো আর হঠাৎ করেই হচ্ছে না। এটা আগে থেকেই ভালো ছিল। এজন্যই হয়তো রিজার্ভে রেকর্ড হচ্ছে। কিন্তু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তো জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে সরাসরি কোনো প্রভাবে ফেলতে পারে না। সেটি হলো ঝুঁকি মোকাবিলার একটা অস্ত্র মাত্র। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার বিজার্ভ বাড়ছে এ নিয়ে এতটা স্বস্তি পাওয়ার কিছু নেই। তবে হ্যাঁ, এটা অবশ্যই আমদানি খাত ও ব্যালান্স অব পেমেন্টের জন্য ইতিবাচক। এখানে আরেকটা বিষয় হলো, এমনও হতে পারে, অনেকেই আবার দেশে ফিরে আসবেন। তারা হয়তো ফেরার আগে জমানো অর্থ দেশে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। ফলে এখন রেমিট্যান্স বাড়লেও দুই মাস পর তো এ প্রবৃদ্ধি নাও থাকতে পারে। কেননা বিশ্বের সব দেশেই তো এখনো সংকট রয়েছে। আর আমাদের শ্রমবাজার তো মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক। যদিও ইউরোপের দেশগুলোতেও কিছুসংখ্যক বাংলাদেশি কাজ করেন, কিন্তু সবখানেই তো অনিশ্চয়তা।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বেড়েছে। মহামারী সত্ত্বেও চাহিদা খুব একটা কমেনি। কিন্তু মানুষের হাতে তো যথেষ্ট পয়সা নেই। অন্যদিকে কাজের সংকট রয়েছে। করোনা পরিস্থিতি তো এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। ডিসেম্বরের মধ্যে নিয়ন্ত্রণে আসবে কি না তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। আরেকটা বিষয় হলো, বিশ্ব অর্থনীতি তো এখনো গভীর সংকটের মধ্যেই আছে। এটা মূল্যায়ন করার জন্য সবচেয়ে দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক। তারা তো বলছে, ২০২১ সাল পর্যন্ত লেগে যাবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে। ফলে আমাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিই বলেন আর বিশ্ব অর্থনীতি, পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে ২০২১ সাল পর্যন্তই লেগে যাবে। তবে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন সচল হতে শুরু করেছে এটা ঠিক।’ কিন্তু কভিড-১৯-এর সংক্রমণ যত দিন থাকবে, সংকট আসলে তত দিনই থাকবে বলে মনে করেন বিশিষ্ট এই অর্থনীতিবিদ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here