দেশের বিভিন্ন নদ-নদীতে পানি বেড়ে যাওয়ায় বন্যা পরিস্থিতি অবনতির দিকে এগোচ্ছে। এ অবস্থায় বন্যা মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সোমবার (৬ সেপ্টেম্বর) গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ভার্চুয়ালি মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে উপস্থিত হয়ে এই নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী।

এসময় মন্ত্রিপরিষদ সদস্যরা সচিবালয় থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন। পরে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বৈঠকের বিষয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, আজকের বৈঠকে অনির্ধারিত আলোচনায় বন্যা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বন্যায় পানির উচ্চতা বিশেষ করে যমুনা ও পদ্মা অববাহিকায় বেড়ে যাচ্ছে। সেজন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে সংশ্লিষ্টদের। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রতিমন্ত্রী এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের বিভিন্ন কর্মসূচি সম্পর্কে অবহিত করেন।
খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রী এ সময় কৃষিমন্ত্রীকে আমন চাষে কোনো অসুবিধা হলে ট্রান্সপ্লান্ট আমনের (টি-আমন) জালা প্রস্তুত রাখতে বলেছেন। কৃষিমন্ত্রী জানিয়েছেন, আমাদের প্রস্তুতি আছে। আশা করছি, বন্যার কারণে এক্ষেত্রে কোনো অসুবিধা হবে না।

সচিব আরও বলেন, কৃষিমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তাকে নির্দেশনা দিয়েছেন যেসব এলাকায় পানি বেড়ে যায়, বিশেষ করে গোয়ালন্দের পরে যমুনা ও পদ্মা যেখানে মিলিত হয়েছে, এসব এলাকার জন্য প্রস্তুত থাকতে। কোনো এলাকায় যদি ভাদ্র মাসে পানি আসে আর বঙ্গোপসাগরে যদি জোয়ার থাকে তাহলে পানি নামতে দেরি হয়। সেক্ষেত্রে আমন চাষে কোনো অসুবিধা হলে, টি-আমন জালা প্রস্তুত রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রী পরামর্শ দিয়েছেন।

সচিব বলেন, কৃষিমন্ত্রী বলেছেন, ৬০ লাখ একর জমিতে আমন চাষের কথা ছিল। ইতোমধ্যে ৫৭ লাখ একর জমিতে চাষ হয়ে গেছে। তারা লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি আছেন। সুতরাং তাদের প্রস্তুতি আছে।
এদিকে, শনিবার (০৪ আগস্ট) বন্যা পূর্বাভাস সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, আগামী ২৪ ঘণ্টায় উত্তরাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হবে এবং তারপর থেকে উন্নতি হতে শুরু করবে। এছাড়াও মধ্যাঞ্চলে আরও ৪৮ ঘণ্টা বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা আছে; তারপর থেকে উন্নত হবে।
উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নদ-নদীর পানি বাড়তে থাকায় দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। কোমর পানিতে তলিয়ে আছে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি। খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে চরম বিপাকে দুর্গত এলাকার মানুষ।
টাঙ্গাইলে প্রবল স্রোতে সড়ক ছাপিয়ে লোকালয়ে ঢুকছে বন্যার পানি। সড়কে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে যানবাহন। তলিয়ে যাচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম।
টাঙ্গাইলে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। যমুনাসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বেড়ে জেলা সদর, বাসাইল, কালিহাতি, ভূয়াপুর, গোপালপুর, নাগরপুর ও মির্জাপুর উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ভেসে গেছে রাস্তাঘাটসহ বিস্তীর্ণ এলাকার সবজি ক্ষেত। পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবন পার করছেন লক্ষাধিক মানুষ।
জামালপুরে সড়কে ঢুকছে বন্যার পানি। ঝুঁকি নিয়ে চলছে ছোটবড় যানবাহন। এরই মধ্যে জেলার ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, মেলান্দহ, মাদারগঞ্জ ও সরিষাবাড়ী উপজেলার ৩৬টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি লক্ষাধিক মানুষ। তলিয়ে আছে প্রায় ৮ হাজার হেক্টর ফসলি জমি। বন্যার্তদের জন্য জেলায় ১শ’ ১২ মেট্রিক টন চাল, সাড়ে ৩৪ লাখ টাকা এবং ১ হাজার শুকনো খাবারের প্যাকেট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য জেলার খবর:
ফরিদপুর
ফরিদপুরে নতুন করে প্লাবিত হয়েছে সদরের ৩ ইউনিয়নের অর্ধ শতাধিক গ্রাম। স্থানীয় কয়েকটি সড়কের বিভিন্ন অংশ ভেঙে গেছে। ভেসে গেছে ফসলের খেত। দেখা দিয়েছে গবাদী পশুর খাদ্য সংকট।
কুড়িগ্রাম
কুড়িগ্রামে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। গত ৪ দিন ধরে পানির নিচে তলিয়ে আছে জেলার ২৫ হাজার ১৫০ হেক্টর রোপা আমন, বীজতলা ও সবজি ক্ষেত। এতে চরম ক্ষতির মুখে চাষিরা।
বগুড়া

বগুড়ায় বন্যার পানি কিছুটা কমেছে। তবে, এখনো পানিবন্দি সোনাতলা এবং ধুনট উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নের প্রায় এক লাখ মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২শ হেক্টর জমির মাশকালাই ও রোপা আমনের বীজতলা। ভেসে গেছে অন্তত ৯০টি পুকুরের মাছ।

 

রংপুর

বন্যা ও ভাঙনে বিপর্যস্ত তিস্তাপাড়ের গ্রামগুলোর বাসিন্দারা। ভাটির টানে হারিয়ে যাচ্ছে জমি। ঘরবাড়ি হারিয়ে দিশেহারা আশ্রয়হীন মানুষ। সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছে তিস্তা, ভাঙ্গণের শব্দে দিশাহারা মানুষ। পড়ে আছে বিধ্বস্ত বাড়িঘর। আশ্রয়হারা মানুষ চলে গেছে উঁচু স্থানের খোঁজে, কেউ গেছে অজানার উদ্দেশ্যে।

 

এবার এ নিয়ে অন্তত ১০ বার বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে তিস্তা নদীর পানি। প্রতিবার পানি বাড়লে বন্যায় ভাসে আর কমলে পাড় ভাঙার নিষ্ঠুর খেলায় নিঃস্ব, অসহায় মানুষ।
রংপুর পাউবোর  নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবিব জানান, ডান তীরে প্রতিরক্ষা বাঁধ থাকলেও বাম তীর অরক্ষিত। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলেই কেবল এর স্থায়ী সামাধান হবে।
রংপুরের গঙ্গাচড়ায় বাঁমতীর ভেঙে গতিপথ বদলেছে তিস্তা। ভাঙণের ঝুঁকিতে পড়েছে রংপুর-লালমনিরহাট সড়কসহ অসংখ্য স্থাপনা। 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here