প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জিয়াউর রহমান পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের খুনিদের পুরস্কৃত করেছিলেন। আর বেগম খালেদা জিয়া আরেক ধাপ এগিয়ে গিয়ে ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর খুনি কর্নেল রশীদকে মহান জাতীয় সংসদে নিয়ে এসেছিলেন।

বুধবার (০১ সেপ্টেম্বর) একাদশ জাতীয় সংসদের চতুর্দশ অধিবেশনে প্রয়াত সংসদ সদস্য অধ্যাপক আলী আশরাফের মৃত্যুতে আনা শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, পঁচাত্তরের পনেরই আগস্টে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে যারা হত্যা করেছে, ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে ও বিভিন্নভাবে তাদেরকে জিয়াউর রহমান পুরষ্কৃত করেছেন। আর খালেদা জিয়া ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর খুনি কর্নেল রশীদকে সংসদ সদস্য করে তাকে বিরোধীদলের নেতার আসনে বসিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, অধ্যাপক আলী আশরাফ যে এলাকা থেকে নির্বাচন করতেন, সেই চান্দিনা এলাকা- সেখানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনি কর্নেল রশিদের বাড়ি। আর তার পাশেই খন্দকার মোশতাকের বাড়ি। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে একটা নির্বাচন হয়। বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থেকে সেই নির্বাচনটি করেছিলেন। সব রাজনৈতিক দল সেই নির্বাচন বয়কট করেছিল। ভোটারবিহীন নির্বাচন- সারাদেশে সেনাবাহিনী নামিয়ে, প্রশাসন-গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করে নির্বাচনটা করা হয়। সেই নির্বাচনে ওই চান্দিনা থেকে কর্নেল রশিদকে নির্বাচিত করে সংসদে নিয়ে আসেন এবং খালেদা জিয়া তাকে বিরোধীদলীয় নেতার আসনে বসিয়েছেন। আর চুয়াডাঙ্গা থেকে নির্বাচিত করেছিলেন মেজর হুদাকে।
সংসদে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ১৫ আগস্টের খুনিদের জিয়াউর রহমান ইনডেমনিটি দিয়ে পুরষ্কৃত করেছিলেন বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে। খালেদা জিয়া বোধ হয় তার থেকে আরও একধাপ ওপরে গিয়ে জনগণের সংসদ, সেই সংসদে একজন খুনিকে এনে বসান। পরে ওই আসনে আবার আলী আশরাফ জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন।
জাতীয় সংসদে কুমিল্লা-৭ আসনের সংসদ সদস্য আলী আশরাফের মৃত্যুতে আনা শোকপ্রস্তাব সর্বসম্মতক্রমে গৃহীত হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা শোকপ্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নেন। আলী আশরাফসহ, সাবেক একজন প্রতিমন্ত্রী, ছয় জন সাবেক সংসদ সদস্যসহ মৃত্যুবরণকারীদের বিদেহী আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সংসদ সদস্যরা আলোচনায় অংশ নেন। পরে এক মিনিট নীরবতা পালন ও তাদের আত্মার শান্তি কামনা করে দোয়া ও মোনাজাত পরিচালনা করেন হাফেজ রুহুল আমিন মাদানী।
শোকপ্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমরা একজন অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ানকে হারিয়েছি। তিনি অসুস্থ হয়ে হাসপাতাল ভর্তি হওয়ার পর তিনি প্রতিনিয়ত খবর নিয়েছেন।  
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আশা ছিল বেঁচে ফিরে আসবেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য অনেক চেষ্টা করেও তাকে আমরা ফিরিয়ে আনতে পারলাম না। এই সংসদের অনেক সদস্যকে আমরা হারিয়েছি। এটা সত্যিই দুঃখজনক।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আলী আশরাফ একজন জ্ঞানী ও বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। তিনি বিভিন্ন সংসদীয় কমিটিতে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি নবীন সংসদ সদস্যদের প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দিতেন বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
মরহুম আলী আশরাফ সমসাময়িক রাজনীতি, অর্থনীতি বিষয়ে ১৫টি বই লিখেছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এগুলো আগামী প্রজন্মকে সমৃদ্ধ করবে।
শোকপ্রস্তাবের উপর আলোচনায়, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও বিরোধীদলীয় উপনেতা গোলাম মোহাম্মদ কাদের, আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক, কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী তাজুল ইসলাম, সিনিয়র সংসদ সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মুহম্মদ ফারুক খান, সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় পার্টির এমপি মসিউর রহমান রাঙ্গা, জাতীয় পার্টির আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, কাজী ফিরোজ রশীদ, বিকল্প ধারার আব্দুল মান্নান, গণফোরামের সংসদ সদস্য সুলতান মো. মনসুর আহমেদ অংশ নেন।
দেশে করোনা সংক্রমণের মাঝেই জাতীয় সংসদের ১৪তম অধিবেশন শুরু হয়েছে। বিকাল ৫টায় স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে এ অধিবেশন শুরু হয়। এবারের অধিবেশন চলবে মাত্র চার কার্যদিবস।

অধিবেশনের শুরুতে প্রথমে সভাপতিমণ্ডলী মনোনয়ন করেন স্পিকার। এবার অধিবেশনে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যরা হলেন- শহীদুজ্জামান সরকার, শামসুল হক টুকু, আবদুল মমিন মণ্ডল আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, শেখ এ্যানি রহমান। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে এদের মধ্যে অগ্রবর্তীজন অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন।

পরে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সংসদে একটি অধ্যাদেশ উত্থাপন করেন। এরপর স্পিকার শোক প্রস্তাব উত্থাপন করেন। চলতি সংসদের কুমিল্লা-৭ আসনের সংসদ সদস্য মো. আলী আশরাফের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করা হয়।

এ ছাড়া সাবেক সংসদ সদস্য আফাজ উদ্দিন আহমেদ, তোফাজ্জল হোসেন সরকার, জামাল উদ্দিন আহম্মদ, খুররম খান চৌধুরী, মো. রেজা খান জাহানারা বেগম এবং আনোয়ার হোসেনের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করা হয়।

এ ছাড়া গণসংগীত শিল্পী ফকির আলমগীর, গীতিকার ফজল-এ-খোদা, হাইকোর্টের বিচারপতি আমির হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্য সচিব এসএ সামাদ, ব্রিটিশ সাংবাদিক সাইমন ড্রিং, জার্মানির ফটুবলার গার্ড মুলার, সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জমান আহমেদের মা শামসুন্নাহার বেগম, সংসদ সদস্য মমতা হেনা লাভলীর মা আনোয়ারা খানম, সংসদ সদস্য নুর উদ্দিন চৌধুরী নয়নের মা মানোয়ারা বেগম, সাবেক তথ্য কমিশনার আবু তাহের, কুরিয়ারচর গ্রুপের চেয়ারম্যান ব্যবসায়ী মুছা মিয়া, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পাইলট নওশাদ আতাউল কাইয়ুম, সংসদ সচিবালয়ের সাবেক সচিব আবুল হাশেম, সংসদ সচিবালয়ের পরিচ্ছন্নতাকর্মী শংকরের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করা হয়।

করোনার কারণে এবারও শুক্রবার অধিবেশন বসবে। ওই দিন বিকাল সাড়ে ৪টায় বসবে অধিবেশন। এ ছাড়া ২ ও ৪ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টায় সংসদ অধিবেশন বসবে। প্রতিদিন ১০০ থেকে ১২০ জন সংসদ সদস্যের উপস্থিতিতে এই অধিবেশন চলবে।

কোভিড-১৯ সংক্রমণের কারণে এবারও কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবে অধিবেশন।  তবে এবারও সংসদে প্রবেশের অনুমতি পাচ্ছেন না সাংবাদিকরা।

এর আগে সংসদের যুগ্মসচিব মো. তারিক মাহমুদ গণমাধ্যমকে জানান, করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে অধিবেশনের সময় সাংবাদিকদের পাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। জনস্বার্থে অধিবেশনের সব কার্যক্রম সংসদ বাংলাদেশ টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার হবে।

আসন্ন অধিবেশনটি হবে চলতি বছরের চতুর্থ অধিবেশন। গত ৩ জুলাই শেষ হয়েছিল সংসদের ১৩তম অধিবেশন, যেটি ছিল বাজেট অধিবেশন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here