পরীমনির প্রতি অবিচার করা হচ্ছে। তার সম্মান ও মানবিক মর্যাদাই শুধু ক্ষুণ্ন করা হয়নি, অপরাধ প্রমাণের আগেই তাকে অপরাধী বানানো হচ্ছে বলে মনে করেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা। নারী ও কন্যা নির্যাতন সামাজিক অনাচার প্রতিরোধ জাতীয় কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় এ কথা বলেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বিচারপতি, অর্থনীতিবিদসহ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।

পরীমনি আত্মহত্যাসহ সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া বিভিন ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পক্ষপাতদুষ্ট ভূমিকা পালন করেছে বলেও তীব্র নিন্দা জানান তারা। অবিলম্বে এসব অনাচার বন্ধের আহ্বান জানিয়ে সামাজিক আন্দোলন জোরদার করার আহ্বান তাদের।

সামাজিক অনাচার কমিটির পক্ষে বেশ কিছু সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়। দুয়েকদিনের মধ্যে পরীমনিসহ অন্যান্য নারীর প্রতি বিচারহীনতার চর্চা রোধে বিশিষ্ট নাগরিকদের স্বাক্ষরসহ বিবৃতি প্রকাশ করা হবে বলে আলোচনা সভায় জানানো হয়।

পরীমনিকে জামিন না দিয়ে এবং তার বিরুদ্ধে মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেভাবে অপপ্রচার করা হচ্ছে এতে তার মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে বলেও নিন্দা জানান তারা। এক্ষেত্রে বিচারের আগে অপরাধী সাব্যস্ত না করা এবং শব্দ প্রয়োগে মিডিয়াকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়।

সামাজিক অনাচার ও প্রতিরোধ কমিটির চেয়ারপারসন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যরিস্টার এম আমিরুল ইসলাম পরীমনিসহ নির্যাতিত নারীদের সহায়তার জন্য মহিলা পরিষদকে লিগ্যাল এইড কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন।

আরও পড়ুন: মানুষ ভুল ত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়: পরীমনি ইস্যুতে পরিচালক

সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘যে সমাজে নারীর মর্যাদা বা সম্মান নেই সে সমাজে সামাজিক বিচার সম্ভব না। পরীমনির মতো কুমারী মেয়েকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে।’

তাকে জামিন না দেওয়ার সমালোচনা করে তিনি বলেন, আমাদের সমাজে নারীদের ওপর যে অত্যাচার ও অনাচার এবং সুশাসনের ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান বিবেচনায় দেখা যাচ্ছে তারা সঠিক বিচার বা সামাজিক সুবিচার পাচ্ছে না। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে  স্থান পাওয়া যে তিনটি মূলনীতির ভিত্তিতে সংবিধান রচিত হয়েছে; সেই তিনটি মূলনীতি সমতা, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যয়বিচার এই তিনটি মূল্যবোধ কতখানি প্রতিফলিত হচ্ছে বা কতখানি নির্বাসিত হচ্ছে সেটা যদি প্রত্যেকটা সময় যাচাই-বাছাই করে দেখি এবং এই ঘটনা বিশ্লেষণ করার ক্ষেত্রেও এই মান দিয়ে বিচার করে দেখি তাহলে দেখা যাবে এখানে সাম্য নাই, মানবিক মর্যাদা বা ন্যায়বিচার নাই। যে কোনো কাজে-কর্মে, সমাজে, উৎপীড়নে, অধিকার নিশ্চিতে ক্ষমতাধর প্রতিষ্ঠান যদি সেটাকে ধ্বংস করে তাহলে বুঝতে হবে আমাদের বাংলাদেশকে খাটো করা হচ্ছে।

মানবাধিকার কর্মী ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল পরীমনিকে গ্রেপ্তারসহ সার্বিক ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করে তাদের সংযত আচরণ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে মনে রাখতে হবে তারা জনগণের স্বার্থে নিয়োজিত বাহিনী। আমাদের করের পয়সায় নিয়োজিত বাহিনী। নারীর সম্মান, মর্যাদা সুরক্ষা দেওয়ার কথা, সেটা না করে তারা নারীকে হয়রানি করছেন, অসম্মান করছেন। আইনের বাইরে গিয়ে সাংবিধানিক ও মানবাধিকার লঙ্ঘন করছেন। তাদের এই আচরণের সুযোগ নিয়ে সামজিক মাধ্যমে আজকে সামাজিকভাবে যেভাবে নারীদের বিষোদগার করা হচ্ছে সরকার এর দায় এড়াতে পারে না।

এই ধরনের আচরণ বাংলাদেশে চলতে পারে না। ব্যক্তিগত, পেশাগত ও সামাজিকভাবে সবাইকে এ ধরনের অনাচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সিপিডির সম্মানিত ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, পরীমনির মতো অনেক অসহায় মানুষ বিচারহীনতার মধ্যে জীবনযাপন করছেন।

এই অর্থনীতিবিদ বলেন, যে প্রত্যাশা ও প্রত্যয় নিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছিল; স্বাধীনতার ৫০ বছরে সার্বজনীন মানবাধিকার ও  গণতান্ত্রিক সুশাসনের ভেতরে অধিকারের নিশ্চয়তার বিষয়টি আজকে প্রশ্নের সম্মুখীন। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে বিচারহীনতা বা নাগরিক অধিকারের যে বরখেলাপ আমরা দেখি, আইনের শাসনের যে ধরনের বিকৃতি আমরা লক্ষ্য করি বা বৈষম্য লক্ষ্য করি এর কতখানি আমাদের গণতান্ত্রিক চর্চা বা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের অবক্ষয়ের ভেতরে নিহিত সেই প্রশ্ন রাখতে চাই। সমাজের ভেতরে নাগরিক অধিকারের জবাবদিহিতার মৌলিক জায়গাটা গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের জায়গাটি যদি শক্তিশালী না হয় তাহলে কি আমরা আশা করতে পারি বিচার ব্যবস্থা কাজ করবে, আইন প্রণেতারা কাজ করবে, মিডিয়া সাহসের সঙ্গে কথা বলবে? আইনের শাসনের বৈষম্যমূলক প্রয়োগ, প্রশাসনিক ব্যবস্থার উগ্র হস্তক্ষেপ আমরা দেখতে পাই নাগরিক অধিকারের মূল জায়গা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব, ভোট দেওয়ার অধিকার নিশ্চিত না হলে রাষ্ট্রের অন্যান্য অংশগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করবে সেটা আশা করা বাতুলতা মাত্র। আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে যথোপযুক্তভাবে তার যে বৈধতার, জবাবদিহিতার অংশগ্রহণমূলক চরিত্র প্রতিস্থাপন করতে না পারি এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকবে।

আরও পড়ুন: নারীর অগ্রগতি থামিয়ে দিতেই পরীমনির ওপর আক্রোশ

মহিলা পরিষদের সভাপতি ও সামাজিক অনাচার প্রতিরোধ কমিটির আহ্বায়ক ড. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, পরীমনিকে গ্রেপ্তারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভিন্ন ধরনের পরিস্থিতির অপচেষ্টা চলছে। আমরা বিশ্বাস করি, অপরাধীর কোনো লিঙ্গভেদ নাই। তাই পুরুষ ও নারী অপরাধীর ক্ষেত্রে একই আচরণ, একই ধরনের আইন, একই ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু দেখতে পাচ্ছি একজন নারীকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনার পর তার প্রতি পুরুষের চেয়ে অনেক ভিন্নতর আচরণ করা হচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণের আগে নারী হলে তার গায়ে কলঙ্ক লেপনের চেষ্টা করা হয়।

আইন প্রয়োগে পুরুষ বা ক্ষমতাধর হলে একরকম অচরণ আর নারী বা দুর্বল হলে আরেকরকম আচরণ সেটা মেনে নেওয়া যায় না। পরীমনিকে নানা বিশেষণে বিশেষায়িত করা নিম্নমানের সাংস্কৃতিক রুচির বহিঃপ্রকাশ। তার বিষয়ে যেভাবে নানা ধরনের অপপ্রচার হচ্ছে, এতে পরী সঠিক বিচার পাবে কি না সেটা নিয়ে আমরা শঙ্কিত। পরীর ঘটনার মধ্যে দিয়ে সমাজের সংস্কৃতির একটা ছবি বেরিয়ে আসল। আমাদের দেশে এক ধরনের ধনী সম্প্রদায় তৈরি হয়েছে। যারা মানি লন্ডারিং, ব্যাংক লুট, মাদকের ব্যবসাসহ নানা ধরনের অগ্রহণযোগ্য উপায়ে প্রচুর অর্থ উপার্জন করছে। দেশে দারিদ্র্যের হার কমলেও উঠতি ধনী ও সাধারণ মানুষের আয়ের মধ্যে আকাশ পাতাল ফারাক। এই যে বৈষম্যের মধ্য দিয়ে একটা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল তৈরি করা হচ্ছে। যারা তুলনামূলকভাবে দুবর্ল তাদেরকে অপরাধ চক্রের সঙ্গে যুক্ত করে ফেলা হচ্ছে। অপরাধী বানিয়ে নির্যাতন করা হচ্ছে। যে ঘটনাগুলো ঘটছে, পরীমনি, পিয়াসা বা মৌ বলেন, দেশে যে নানা ধরনের অসৎ উপায়ে অর্থ উপার্জন হচ্ছে সেই পরিবেশটা আমাদের সমগ্র সমাজকে এক ধরনের অপরাধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে সমাজ অল্প দিনেই অধঃপতনের দিকে চলে যেতে পারে। আমাদের জান মালের, নারী জীবনের সম্মানের কোনো নিরাপত্তা দেখতে পাচ্ছি না।

তিনি আরও বলেন, এভাবে যদি ক্ষমতাসীনরা একের পর এক আইনের অপব্যবহার করতে থাকে,  তাহলে দেশের মানুষ কীভাবে বিচার পাবে বুঝতে পারছি না। এই পরিস্থিতির পরিবর্তনের মূল হাতিয়ার জনগণ। জনগণকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here