দেশে করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। প্রতিদিনই নতুন রোগী শনাক্ত ও মৃত্যু দুটোই বাড়ছে। দৈনিক রোগী শনাক্ত আবার ৬ হাজার ছাড়িয়েছে। করোনার ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণে সারা দেশই এখন উচ্চ ঝুঁকিতে। ৫০টির বেশি জেলায় অতি উচ্চ সংক্রমণ রয়েছে বলে মত দিয়েছে করোনা সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বলেছে, দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৪০টিই সংক্রমণের অতি উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট বা ডেল্টা ধরনের সামাজিক সংক্রমণ চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কমিটি। এই অবস্থায় এটি প্রতিরোধে খণ্ড খণ্ডভাবে নেয়া কর্মসূচির উপযোগিতা প্রশ্নবিদ্ধ উল্লেখ করে সারা দেশে ১৪ দিনের পূর্ণ শাটডাউনের সুপারিশ করেছে কমিটি।

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সুপারিশকে যৌক্তিক বলে মনে করছেন। বলেছেন, সরকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। প্রয়োজনে যেকোনো সময় জাতীয় কমিটির সুপারিশের আলোকে সরকারি ঘোষণা আসতে পারে।

কারিগরি পরামর্শক কমিটির ৩৮তম সভা শেষে গতকাল সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লাহ স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দেশে কোভিড-১৯ রোগে ভারতীয় ডেল্টা ধরনের সামাজিক সংক্রমণ চিহ্নিত হয়েছে। ইতিমধ্যে এর প্রকোপ অনেক বেড়েছে। এ প্রজাতির জীবাণুর সংক্রমণ ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে সারা দেশেই উচ্চ সংক্রমণ, পঞ্চাশটির বেশি জেলায় অতি উচ্চ সংক্রমণ লক্ষ্য করা গেছে। এটি প্রতিরোধে খণ্ড খণ্ডভাবে নেয়া কর্মসূচির উপযোগিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বলে কমিটি মনে করে।

অন্যান্য দেশ, বিশেষত পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের অভিজ্ঞতা হলো, কঠোর ব্যবস্থা ছাড়া এর বিস্তৃতি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। ভারতের শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তাদের মতামত অনুযায়ী, যেসব স্থানে পূর্ণ ‘শাটডাউন’ প্রয়োগ করা হয়েছে সেখানে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা গেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া ঠেকাতে এবং জনগণের জীবনের ক্ষতি প্রতিরোধে কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে সারা দেশে কমপক্ষে ১৪ দিন সম্পূর্ণ ‘শাটডাউন’ দেয়ার সুপারিশ করছে। এতে আরও বলা হয়, জরুরি সেবা ছাড়া যানবাহন, অফিস-আদালতসহ সবকিছু বন্ধ রাখা প্রয়োজন। এ ব্যবস্থা কঠোরভাবে পালন করতে না পারলে আমাদের যত প্রস্তুতিই থাকুক না কেন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা অপ্রতুল হয়ে পড়বে। এতে আরও বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী কোভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন সংগ্রহের জন্য সর্বাত্মক উদ্যোগ নিয়েছেন। এ জন্য সভায় তাকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়। এ রোগ থেকে পূর্ণ মুক্তির জন্য ৮০ শতাংশের বেশি মানুষকে ভ্যাকসিন দেয়া প্রয়োজন। বিদেশ থেকে টিকা সংগ্রহ, লাইসেন্সের মাধ্যমে দেশে টিকা উৎপাদন করা এবং নিজস্ব টিকা তৈরির জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে গবেষণার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রচেষ্টার প্রতি কমিটি পূর্ণ সমর্থন জানায়।

এমন পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আশঙ্কা করছে, স্বাস্থ্যবিধি এবং সরকারের দেয়া বিধিনিষেধ না মানলে চলমান করোনা পরিস্থিতি শোচনীয় পর্যায়ে চলে যেতে পারে। দেশে করোনার প্রথম ও দ্বিতীয় ঢেউয়ের শুরুতে সংক্রমণ এবং মৃত্যু বেশি ছিল ঢাকা, চট্টগ্রামে। এখন সংক্রমণ ও মৃত্যু দুটোই বেশি ঢাকার বাইরে। বিশেষ করে উত্তর এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে দেশের বিভিন্ন জেলায় লকডাউন চলছে। রাজধানী ঢাকাকে বিচ্ছিন্ন রাখতে আশপাশের ৪ জেলাসহ ৭ জেলায় লকডাউন দেয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত রাজধানীতে করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতির খুব বেশি অবনতি হয়নি। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সূচকে ঢাকা এখন সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। ঢাকায় লকডাউন হবে কিনা- এমন প্রশ্নের উত্তরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে, আশেপাশের মানুষজনকে ঠেকিয়ে রাখতে না পারলে ঢাকার পরিস্থিতি নাজুক হয়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে লকডাউনের প্রয়োজন হতে পারে। লকডাউন সঠিকভাবে পালিত হলে ঢাকামুখী মানুষের যাত্রা কমে যাবে।

দেশের সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ে গত মঙ্গলবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ১৪ই থেকে ২০শে জুন এই এক সপ্তাহের নমুনা পরীক্ষা ও রোগী শনাক্তের হার বিবেচনা করে ৩টি মাত্রার ঝুঁকি (অতি উচ্চ, উচ্চ ও মধ্যম) চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি। তাতে বলা হয়েছে, ৬৪টি জেলার মধ্যে ৪০টিই সংক্রমণের অতি উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। এর বাইরে আরও ১৫টি জেলা আছে সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে। সংক্রমণের মধ্যম ঝুঁকিতে আছে ৮টি জেলা। বান্দরবানে নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা কম হওয়ায় সেটি বিবেচনায় আনা হয়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, খুলনা বিভাগের ১০টি জেলার সবক’টিই সংক্রমণের অতি উচ্চ ঝুঁকিতে আছে। রাজশাহী বিভাগের ৮ জেলার মধ্যে ৬টি অতি উচ্চ ঝুঁকিতে, ২টি আছে উচ্চ ঝুঁকিতে। ঢাকা বিভাগের মধ্যে ৭টি জেলা আছে অতি উচ্চ ঝুঁকিতে। রাজধানীসহ ২টি জেলা আছে উচ্চ ঝুঁকিতে আর ৪টি জেলা আছে মধ্যম ঝুঁকিতে। রংপুর বিভাগের ৫টি অতি উচ্চ এবং ৩টি জেলা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ। চট্টগ্রাম বিভাগের মধ্যে চট্টগ্রামসহ ৬টি জেলা অতি উচ্চ, ৩টি জেলা উচ্চ এবং একটি জেলা মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ। বরিশাল বিভাগে ৩টি জেলা অতি উচ্চ ঝুঁকিতে এবং মধ্যম ঝুঁকিতে ৩টি জেলা। সংক্রমণ এখনো তুলনামূলক কম সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগে। কয়েকটি জেলায় লকডাউন দেয়া হলেও উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সংক্রমণ পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না; বরং তা দিন দিন খারাপ হচ্ছে। এখন পরিস্থিতির বেশি অবনতি হয়েছে খুলনা বিভাগে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here